Tuesday, 14 January 2014

৫:২৫ এর হলদিয়া লোকাল

দিন টা পাঁচই অগাস্ট ২০০৭| মা আর বাবা কে কুক্রাহাটিগামী বাসে তুলে দিয়ে এলাম ডা: বি.সি. হাসপাতালের সামনে থেকে। দেখতে পারছিলাম  সামনের চারটে বছর  কি ভাবে আমার দিকে হাথ বাড়াচ্ছে।

Engineering college এর 1st year টা কারুর ই খুব একটা ভালো কাটেনা।তার ওপর আবার হলদিয়া প্রযুক্তি সংস্থান রাগ্গিং এর  জন্য infamous ছিল, তা বলা যেতে ই  পারে।আর যদি কেউ মেয়ে 'পটায়' তাহলে তো আর দেখতে হয়না! আমার case  টা কিছূটা এরকম  ই  ছিল।বুঝতে পারলামনা যে কি ভাবে পা পিছলে মুখ থুবরে পড়লাম । জীবনের প্রথম প্রেম  সেই  1st year-এ। তারপর ডেন্টাল কলেজের ক্যাম্পাসে হাথ ধরে ঘোরা, senior দের থেকে 'চাটন' খাওয়া, সব কিছুর ই  মোটামুটি অভিজ্ঞতা হয়ে গেছিল , শুধু মার বা চলতি ভাষায় 'কেলানি' টা বাকি ছিল।

৮ মাস থাকার পর আমাদের বি.সি. রায় হোস্টেল থেকে সরিয়ে কলেজের থেকে ঢিল ছোড়া দুরত্বে একটা হোস্টেলে রাখা হয়। আশ্চর্যের বাপার এটা ছিল যে আমরা কেউই হোস্টেলের আসল নাম তা জানতামনা; জানলাম যদি ও অনেকদিন পর - Haldia Logistics Hostel। তবে আজ ও আমরা আমাদের সেই হোস্টেল টা কে Aakash Inn ই বলি। প্রথম-প্রথম হলদিয়া কেমন একটা বিশ্রী জায়গা লাগত, হয়ত বাড়ির সেই পরিবেশ টা পেতামনা। তখন আমি একটা সামান্য সত্তি বুঝিনি - বন্ধু দের সাথে থাকতে ই বেশি আনন্দ।


First year কোনো রকমে কী যাবার পর 2nd year এর সূচনা। 2nd year টা কিছু টা senior দের চাপে আর বাকি তা আনন্দ করে কেটে গেল।


তারপর 3rd year এর আগমন হইলো! বুঝলাম প্রেমের মানে কি হয়, খুব কাছ থেকে দেখলাম জীবন টা কে। ভাবতে অবাক লাগত যে কি তুচ্ছ আমাদের জীবন - সময় আস্লে হীরের মত সক্ত বিশ্বাস কি ভাবে গুড়িয়ে যায়। মনে হয়েছিল সব কিছু যেন হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু এইসবের পর যেন নিজে কে কথাও কুড়িয়ে পেলাম, আর বন্ধুত্বের আসল মানে টা খোজার চেষ্টা করলাম। অনেক কিছু জানলাম, বুঝলাম, শিখলাম, বোঝালাম ও শেখালাম। Cigarette-r counter সে যে এক অমূল্য ও এক আশ্চর্যের জিনিস হয় sem এর সময়ে, সেটা বর্ণনা করা সত্যি দুষ্কর। কোনো-কোনো বার তো এমন ও হয়েছে যে ১টা সিগারেট আর পাঁচ জন দাবিদার, শেষে বিড়ি তে কাউন্টার মেরে ধুম্রপিপাসা মেটাতে হল। এই রকম কেটে গেল ইঞ্জিনিয়ারিং এর তৃতীয় বর্ষ।
সামার ট্রেনিং করে ২ মাস নষ্ট করার পর হলদিয়া ফিরলাম। শেষ বছর। মনে হচ্ছিল সব যেন প্রায় শেষ হয়ে গেল। তখন আমরা ৭৫% ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গেছি। 4th year শুরু হলো পাগলামি দিয়ে। এক খুবই ভালো বন্ধু হাথ কাটল, তারপর পাঁচ তলার কার্নিশ থেকে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা, শেষ-মেষ হাসপাতালই গন্তব্য। দেখাশোনা টা বলা যেতে পারে রাণা, আমি আর কযেকজন বন্ধুরা মিলে করলাম। হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ হবার পর   এই বন্ধুটির পাগলামি এক অদ্ভূত উচ্চতা অতিক্রান্ত করল। আর সংযোগবসত ডিসচার্জ-এর দিনই Electrical Engg. Deptt. এর 2nd year এর কিছু  বাচ্চা আমাদের হোস্টেলে এসে "demand" টা পুরো করে দিয়ে গেল। এবং সেই পাগলামি কে থামাতে আমরা সুধারস পান করিয়া নানা কীর্তি-কলাপ করিলাম। পাগলামি টা বেশ অনেক টা ই আয়ত্তে এসে গেছিল কিন্তু আমরা কযেকজন কত টা আয়ত্তে ছিলাম ঠিক বলতে পারবনা। প্রথম বার প্রচুর পরিমানে খেলে যা হয় আর কি। সেই থেকে বাপার টা রাণার ঘরে (Room E-15) সপ্তাহে ২ বার আয়োজন করা হত। রাণা গান গাইত, আমরা যোগ দিতাম। মাঝে মাঝে হিমাদ্রি (aka Himu) drums বাজাত। অসাধারণ drums বজায় হিমু, রাণার গিটার ছাড়া যেন আড্ডা টা জমতই না। ওফ! সে এক অদ্ভূত অনুভূতি ছিল।

4th year এর শেষের দিকে ডিপার্টমেন্ট-এর জুনিয়র রা farewell দিয়ে officially বিদায় জানালো। অসাধারণ ছিল! Event টা শেষ হবার ঠিক আগে আমাদের departmental t-shirts দেওয়া হলো। তখন প্রায় সবাই বেশ এমতীয়নাল হয়ে যায়, সাভাবিক ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর armageddon টা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। কিছুদিন পর জুনিয়র দের ধন্যবাদ বলার জন্য আর একটা হোস্টেলের ছাদে নৈসনেশার আয়োজন করা হয়। সারারাত 'হুলিয়ে' পার্টি করা হল। মদ্যিখানে কোনো এক জুনিয়রের nostalgic হয়ে পরেছিল। আর তারপর chain রিঅ্যাকশন।

শেষ semester-এর শেষ পরীক্ষা। খুব বাজে গার্ড পরেছিল, $%^#!@ টা ঘাড় ঘোরাতে দেয়নি, অনেক ছেলে-মেয়ে রা চোথা নামাতে পারেনি। কিন্তু তাও পরীক্ষার পরই এর-তার শার্ট ছেড়া, শার্টে কমেন্টস লেখা, ইত্যাদি চলছিল। রাতে কলেজের lawn-এ বসে B.Tech. কমপ্লিট করা চলছিল। বেশ আনন্দই হচ্ছিল। ইতি মধ্যে খবর এল যে এক বন্ধু বাইক দুঘটনায় মারা গিয়েছে। ৩-৪ ঘন্টা আগে ওর সাথে কথা বলে এলাম। ওর গ্রুপে ও দ্বিতীয় ছিল। প্রথম যে ছিল, সে আমার পাশের ঘরে থাকত, খুব ভালো ছেলে এবং বন্ধু ছিল। সে যায় ফেব্রুয়ারী তে আর এ যায় মে তে। জীবন টা কেমন অদ্ভূত, তাই না?

Clearence নিয়ে নিয়েছিলাম, অর্ধেক জিনিস পত্র ও বাড়ি তে রেখে আসা হয়ে গেছিল। এবার শেষ বার এর জন্য বিদায়ের পালা। আমি হোস্টেলের বাইরে দাড়িয়ে এক-এক করে সবাই কে চলে যেতে দেখছিলাম। ভয় ছিল যে সবাই হারিয়ে যাবে এক দিন। ইতি মধ্যে রাণার বাবা কে আসতে দেখলাম। রাণা কে বললাম আর এক দিন থেকে যেতে। সেইদিন রাতে ৫ তলার ব্যালকনি তে দাড়িয়ে শেষ বারের জন্য এক সাথে সিগারেট খেলাম। পরের দিন ও কে স্টেশানে ছাড়তে হিমাদ্রি, আমি আর প্রলয় যাই।


Tipu, Kaushik, Rana, Proloy, Himadri

তারপর ট্রেন টা ছেড়ে দিল, চোখের জল টা আর আটকাতে পারলামনা। তখন বুঝলাম বিগত বছর আমাকে কি শিখেয়েছে - বন্ধুত্ব চুপিসারে ভ্রাত্তিত্বে পরিনত হয়।
তারপর ট্রেনে নিজের মাল-পাট গুছিয়ে নিয়ে রউনা দিলাম। তবে তার আগে নিজের roommate দের সাথে দেখা না হবার ফলে ওদের জন্য একটা ছোট নোট ছেড়ে গেছিলাম, ওদের মত roommate খুব ভাগ্য করে পাওয়া যায়। চন্দ্র, অরিজীতা আর আমি বেরিয়ে পরলাম নিজের জিনিস-পত্র নিয়ে শেষ বারের জন্য ধরতে ৫:২৫ এর হলদিয়া লোকাল।

----- ইতি -----